ঝরা বকুলের গল্পঃ বাংলাদেশের নারী চলচ্চিত্র পরিচালকদের যিনি পথিকৃৎ

ছবিঃ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড
বাংলাদেশে বর্তমানে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও পরিচালনায় পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন নারী পরিচালকেরা। সংখ্যাটা এখনও পুরুষদের তুলনায় নগন্য হলেও আশা জাগানিয়া বিষয় হলো,
নারী পরিচালকের তালিকায় দিন দিন যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন নাম।

র্বতমানে বাংলাদেশের নারী পরিচালকেরা যে পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছেন, সে পথের দিশারী ছিলেন মনজন আরা বেগম রেবেকা। যার ডাকনাম ছিলো বকুল। তবে তিনি রেবেকা নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনিই বাংলাদেশের প্রথম নারী চলচ্চিত্র পরিচালক।
রেবেকা পরিচালিত প্রথম এবং একমাত্র চলচ্চিত্রের নাম ‘বিন্দু থেকে বৃত্ত’। এটি ১৯৭০ সালে মুক্তি পায়। এ সিনেমাটি নির্মাণের আগে তিনি অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তখন অবশ্য রাত্রী রায় নামে অভিনয় করতেন।
পরিচালক জিল্লুর রহমানের সিনেমা এই তো জীবন-এ অভিনয়ের মধ্যদিয়ে ১৯৬৪ সালে মনজন আরা বেগম রেবেকার অভিনয় জীবনের শুরু। এরপর একে একে অভিনয় করেছেন মোট ১৪টি সিনেমায়। তাঁর নিজের পরিচালিত সিনেমা ‘বিন্দু থেকে বৃত্ত’-তেও তিনি অভিনয় করেছেন। সে হিসেবে তাঁর অভিনীত সিনেমার সংখ্যা মোট ১৫টি।
তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে- বশীর হোসেন পরিচালিত ১৩ নং ফেকু ওস্তাগার লেন, জহির রায়হানের বাহানা, এহতেশামের ডাকবাবু, নুরুল হক বাচ্চুর আগুন নিয়ে খেলা।

চলচ্চিত্র পরিচালনা প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে রেবেকা বলেন, “১৯৬৯ সালের কথা। দেশের অবস্থা তখন উত্তাল। কারফিউ চলছে। ঘরের বাইরে বেরোনোর উপায় নেই। সেই অবস্থায় শুরু করলাম ছবিটা। পুরুষরা যা পারে তা যে মেয়েরাও পারে- সেই বোধ চিরকাল আমার ভেতরে কাজ করেছে। একজন নারীও যে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারে সেটা করে দেখানোর জন্য। আমি নিজেই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছি। তবে এর পটভূমি ছিলো দীর্ঘ। প্রস্তুতিও ছিলো অনেক দিনের। আসলে, কোনো কিছু সৃষ্টি করবো- এটাই ছিল মূল কথা। উদ্দেশ্য তো ছিলোই। প্রথমত, উর্দু ছবির প্রতিবাদ। দ্বিতীয়ত, নিজেদের কাজ দ্বারা এটা প্রমাণ করা যে চেষ্টাতে, ইচ্ছাতে সব হয়। তৃতীয়ত, রাজনীতি থেকে আত্নগোপন করলেও রাজনৈতিক প্রতিবাদের বলিষ্ঠতা প্রতীকের সাহয্য প্রকাশ করা।” (সূত্রঃ রেবেকা:বাংলাদেশের প্রথম নারী চলচ্চিত্র পরিচালক, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ২৭ মার্চ ২০২২)
‘বিন্দু থেকে বৃত্ত’ সিনেমার তিনি ছিলেন একাধারে কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার, সংলাপ লেখক, পরিচালক এবং অভিনয়শিল্পী। চলচ্চিত্রটি সমালোচকদের প্রশংসা কুড়োলেও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর সিনেমাটির নেগেটিভ বা প্রিন্ট ভার্সন কোথাও পাওয়া যায়নি। পাকিস্তানি আর্মিরা পুড়িয়ে ফেলেছে বলে ধারণা করা হয়।
চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াৎ-এর মতে, “রেবেকা সবসময় এগিয়ে যাওয়া নারীদের প্রতিনিধিত্ব করবেন। এ প্রজন্মের যে সকল নারীরা চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন, তাদের পথিকৃৎ তিনি। তখনকার সমাজব্যবস্থার কথা যদি চিন্তা করি তাহলে দেখা যাবে, ওই সময়টায় একজন নারীর পক্ষে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা খুব কঠিন কাজ ছিল। বিশেষ করে মুসলিম সমাজে তো এটা কল্পনাও করাই যেত না। কিন্তু রেবেকা সমাজের চাপে পিষ্ট হননি। বরং নিজের ভেতরের শিল্প সত্তাকে বিকশিত করতে সাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন।” তবে দেশের প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে রাষ্ট্র তাকে যথার্থ মূল্যায়ন করেনি বলে আক্ষেপ করেন অনুপম হায়াৎ। (সূত্রঃ ‘যথার্থ মূল্যায়ন পাননি প্রথম নারী চলচ্চিত্র নির্মাতা রেবেকা’, ঢাকা মেইল, ০৮ মার্চ ২০২২)
চলচ্চিত্র পরিচালনা এবং অভিনয় ছাড়াও রেবেকা ভাস্কর্য তৈরি, কবিতা-গল্প লেখা, বিজ্ঞাপন চিত্রে কাজ, গীতিনাট্য রচনা, টিভি অনুষ্ঠান নির্মাণ করেছেন। রেবেকার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ছয়টি। এর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো, ব্যাকুল ঠোঁটের বৃষ্টি, নদী বুঝি ডাকে ভালোবাসার ভূখণ্ডে।
কাজের স্বীকৃতি তেমন পাননি রেবেকা। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি চলচ্চিত্রের শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে ১৯৯৫ সালে তাঁকে সম্মাননা দেয়। সমাজ সেবায় অবদানের জন্য পাবনা কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে স্বর্ণপদক পান।
সরকারি অনুদানে তাঁকে নিয়ে নির্মিত হচ্ছে স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র 'বিন্দু থেকে বৃত্ত: একজন বকুলের আখ্যান'। এটি নির্মাণ করছেন মেহজাদ গালিব।
২০০৬ সালে মারা যান কীর্তিমান এ নারী।



Comments